আমার একলা নদী
এত শব্দ ভালো লাগছেনা। এত কোলাহল অসহ্য। চারিদিক যেন কেমন অর্থহীন হাহাকারে
মেতে উঠেছে। বর্ষশেষের উৎসবে উদ্বেল মানুষজন। যেন উৎসব, পার্বণ নিংড়ে ছিবড়ে করে
দিয়ে চেটেপুটে সবটুকু সাবাড় করতে হবে। শব্দ, শব্দ। চারিদিকে শব্দ, কোলাহল, হইচই,
চিৎকার। সত্যি বলছি, ভালো লাগছেনা একটুকুও। একটু নীরবতা চাই। চাই একটু নিজস্ব
শান্ত সময়। জানিনা কিভাবে সব স্তব্ধ করব। কিভাবে প্রতিবাদ করব, তাও জানা নেই। প্রতিবাদ করার উদ্যমও যেন হারিয়ে ফেলেছি। তার চেয়ে ভালো, যদি এক্ষুনি পালিয়ে যেতে পারি।
বেশ, খুব ভালো। হাঁটা যাক তবে সেই পালিয়ে যাওয়া
পথ ধরে। পিছু হাঁটতে থাকি। পিছু হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সেই নদীর কাছে। পিছু হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই অন্য কোনও এক বর্ষশেষের উৎসবমুখর দিনে। না, সেদিন সেখানে ছিলনা কোনও চিৎকার, কোলাহল বা অর্থহীন উৎসব শব্দ। সত্যিই ছিল না কি
শব্দ? শব্দ ছিল। কিন্তু সে শব্দ চিৎকার নয়।
সে শব্দ কোলাহল নয়। শব্দ বলতে নদীর গান। সেদিন একা হয়েছিলাম নদীর সঙ্গে।
পাকদণ্ডী বেয়ে নেমে আসছিল গাড়ি। পেডং থেকে রিশিখোলার রাস্তা ধরে।
পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিমের সীমান্তে। কারশিয়াং মহকুমা। ইচ্ছে ছিল বর্ষশেষের ছুটিতে হবো
একটু নির্জনতাবিলাসী। পাড়ি দিয়েছিলাম নদীর সন্ধানে। জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি নদী। অনেক
দূর থেকেই কানে আসছিল কলতান। বুঝতে পারছিলাম না কোন বনান্তের অন্তরালে শুয়ে আছে
আমার একলা নদী—রিশিখোলা। সে যেন ছিল এক অজানা উৎকণ্ঠা। কিভাবে দেখব রিশিখোলা!
বাঁকাচোরা পাহাড়ি পিচরাস্তা ছেড়ে গাড়ি নামতে লাগলো নুড়ি বিছানো ঢাল বেয়ে।
অতি সন্তর্পণে। চোখে পড়লো এক ঝলক তরঙ্গিণী। একটানা কুলুকুলু শব্দ। গাছগাছালির
পোশাক গায়ে পাহাড়ের কোলে নিজেকে বিছিয়ে দিয়েছে যেন রিশিখোলা। গাড়ি ধীরে নেমে এল
নদী খাতে। চারিদিকে ছড়ানো অসংখ্য নুড়ি-পাথর। কিছুটা জল মাড়িয়ে গাড়ি এসে থামলো নদীর
মাঝখানে। সেখানে জল নেই। শুধু নুড়ি-পাথর আর ঝিকমিক সাদা বালি। তারপর আবার জল। বয়ে
চলা হাঁটুজল। আর জল ডিঙানো একটা ছোট্ট সাঁকো। বাঁশ আর কাঠের। তার ওপারে নদীর গায়েই
আমার আগামী দু’দিনের অস্থায়ী ঠিকানা। চারিদিক সবুজে ঢাকা। পাশে এলোচুল নদী।
দু’দিন নদীর কাছে ছিলাম। দুটো গোটা দিন। অবিরত নদীর গান। খুব কাছ থেকে
দেখেছিলাম নদীকে। শরীরের সব হিল্লোল। কখনও খোলা জানালার পাশে বসে। কখনও বড় পাথরের
ওপর গুটিসুটি হয়ে বসে। প্রতিটা মুহূর্তে টের পাচ্ছিল এক অদ্ভুত অন্তহীনতা। দু’পাশ
পাহাড়ে ঘেরা। গাছগাছালিতে ভরা। অজানা, অখ্যাত নদী আমার। একলা নদী আমার। বহমান।
দুপুরের খাওয়া সেরে বসেছিলাম নদীর ধারে একটা বড় পাথরের ওপর। টের পাইনি কখন
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পাহাড়ের ওপর গাছপালা ডিঙিয়ে সূর্য পশ্চিমে তলিয়ে গেছে। গাছের
ফাঁকে ফাঁকে শেষ বিকেলের আলোর লুকোচুরি। নীরবে শেষ হতে চলেছে একটা বছর। শান্ত জঙ্গল।
মৌন পাহাড়। নদীর গান শুনতে শুনতে শেষ হয়ে যাচ্ছিল আরও একটা বছর। আর একা আমি ক্রমশ
মগ্ন হয়ে যাচ্ছিলাম এক দুর্লভ নিস্তরঙ্গতায়।
নদীর পাড় ধরে একটা পায়ে চলা রাস্তা। জঙ্গলের ভেতরে ভেতরে। চলে গেছে অনেক
দূর। উদ্দেশ্যহীনভাবে ধরলাম সেই পথ। অদ্ভুত এক বুনো গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ।
গাছেদের প্রত্যেকটা পাতা যেন নেশাচ্ছন্ন। পাখিদের ঘরে ফেরার গান। এখুনি ফুরিয়ে
যাবে আরও একটা দিন। ঝুপ করে নেমে আসবে সন্ধ্যে। তারপর শেষ হবে পেরিয়ে আসা বছর।
সারি সারি গাছ, ঝোপ জঙ্গল, নদীর বুকের পাথরেরা, ছড়ানো নুড়ি, বালি—সবই যেন সেই
আশঙ্কার অপেক্ষায়। নিশ্চুপ অপেক্ষা আরও একটা সন্ধ্যের। নিশ্চুপ অপেক্ষা
বর্ষশেষের।
সেদিন একবারও ফিরে আসতে ইচ্ছে হচ্ছিলনা। মনে হচ্ছিল এগিয়ে যাই। কেবল এগিয়ে
যাই। যত দূরই হোক হেঁটে যাই। পৌঁছে যাই শেষ অবধি। জেনে আসি নদীর শেষ। ‘নদীর শেষ’—ভাবনাটা
যেন খান খান করে দিল আমার চেতনা। নদী কি আদৌ কখনও শেষ হয়? শেষ জানলে যে সবকিছু শেষ
হয়ে যায়। রহস্য হারিয়ে যায় স্বাভাবিকতায়। পায়ে পায়ে ফিরে চলি আমার অস্থায়ী
আস্তানার দিকে। গাছপালারা তখন ডুব দিয়েছে মনকেমনের আবছায়ায়। তারার ডালিতে আকাশ, আলোর
ফোঁটায় ফোঁটায় ছোট ছোট পাহাড়ি জনপদ জানান দিচ্ছে তাদের অস্তিত্ব। আমি ফিরে এসে
দাঁড়ালাম বাঁশের সাঁকোর ওপর। নীচ দিয়ে বয়ে চলা আমার একলা নদী—রিশিখোলা।
বর্ষশেষের শীত উপেক্ষা করে একটা ছাউনীর টিমটিমে আলোর নিচে বসে থেকে অনেক
রাত অবধি দেখছিলাম অন্ধকার। অন্ধকার গলে গলে পড়ছিল নদীর বুকে, পাহাড়ের চূড়ায়, গাছে
গাছে। নীরব তারারা যেন গা ভাসিয়েছে প্রাত্যহিকতায়। বছর শেষ হয়ে আসছিল নির্বিকারভাবে, যেন নিরুচ্চারে বিদায় নিচ্ছে
প্রকৃতির কাছ থেকে। প্রকৃতির নির্মাণ যেন প্রকৃতি নিজেই ভেঙ্গে ফেলছিল নিঃশব্দে।
রাতের অন্ধকারে। এরপর রাতারাতি শুরু হয়ে যাবে নতুনের নির্মাণ।
হঠাৎ-ই যেন ভীষণ ভালো লাগতে শুরু করল। অন্ধকার ভেঙ্গে নেমে গেলাম নদীর বুকে। নদীকে
ছুঁলাম আমার দু’হাত দিয়ে। তারপর ফিসফিস করে বললাম—‘রিশিখোলা, আমার একলা নদী, আমি
আবার ফিরে আসব তোমার কাছে। আমি নিজেকে হারাবো তোমার নুড়ি, পাথর, বালি আর দু’ধারের
গাছগাছালির আদিমতায়। আমি আবার একলা হবো তোমার সাথে কোন একদিন’।